আলী হোসেন, কুষ্টিয়াঃ ১২ ই ফেব্রুয়ারী জাতীয় নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি জোট বনাম জামায়াতের ৮ দলীয় জোট। ইতিমধ্যে সারাদেশে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এ-ই হাওয়ার বাইরে নেই কুষ্টিয়া -৪ আসন। বরং এ-ই আসনে হাওয়া একটু বেশিই বইছে।

জাতীয় সংসদের ৭৮ নং আসন কুষ্টিয়া – ৪ ( কুমারখালী – খোকসা ) আসন। এ-ই আসনটা কুমারখালী ও খোকসা উপজেলার ২ টা পৌরসভা ও ২০ টা ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত । ভোটার আছে ৪ লক্ষ ১৫ হাজারেরও বেশি। তারমধ্য কুমারখালী উপজেলাতে ভোটার আছে ২ লক্ষ ৮৬ হাজার আর খোকসা উপজেলাতে আছে ১ লক্ষ ১৬ হাজার। ভোটার আনুপাতিক হার পুরুষ – মহিলা প্রায় সমান।
এ-ই আসনটা কুষ্টিয়া জেলার শেষ সীমানায় হওয়ায় রাজবাড়ী, পাবনা ও মাগুরা জেলার সাথে ভৌগোলিক সম্পর্ক রয়েছে। তা-ই এখানকার ভোটের উত্তাপ আশপাশের জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। এ-ই সংসদীয় অঞ্চলের কুমারখালী উপজেলার মানুষ তাঁতশিল্পের উপর নির্ভরশীল এবং দারিদ্রমুক্ত আর খোকসা উপজেলা মানুষ কৃষি উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী।
কুষ্টিয়া -৪ আসনটির অতীত নির্বাচনের ফলাফল বলে, কোন দল ও ব্যাক্তি এ-ই আসনে এককভাবে রাজত্ব করতে পারেনি। ৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর ৯১ সালের নির্বাচনে আঃলীগ এ-ই আসন পায়। প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয় জামায়াতের সাথে। বিএনপির অবস্থান তৃতীয় হয়। ৯৬ সালের নির্বাচনে অল্পকিছু ভোটের ব্যবধানে বিএনপি এ-ই আসনে জয়লাভ করে। জামায়াতে সামান্য ভোটের ব্যবধানে তৃতীয় হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি- জামায়াত জোট আঃলীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে। আবার ২০০৮ সালে বিএনপি – জামায়াত জোটের ধানের শীষের প্রার্থী আঃলীগের কাছে পরাজিত হয়। তারপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি – জামায়াত জোট অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ২০১৮ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের ধানের শীষের প্রার্থী ১৮ ঘন্টাও মাঠে দাঁড়াতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামী এ-ই নির্বাচন বর্জন করে। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনে আঃলীগের ডামি প্রার্থী জয়লাভ করে।
১২ ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে এ-ই আসনে প্রার্থী হয়েছেন, বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, জামায়াতে ইসলামীর কুমারখালী উপজেলা নায়েবি আমীর সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আফজাল হোসাইন, ইসলামি আন্দোলনের আনোয়ার খান , বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ফজলে নূর ডিকো, গণঅধিকার পরিষদের শাকিল আহমদ তিয়াস। বাদবাকি দলগুলোর কিছু প্রার্থী আলোচনায় থাকলেও এখনো নিশ্চিত হয়নি।
বিএনপির হাইকমান্ড এ-ই আসনে প্রার্থী দিয়েছে সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীকে । দলীয় মধ্যে থেকে একটা অংশ তার নমিনেশন বাতিলের দাবিতে ৩ ই নভেম্বরের রাত থেকে কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক পৌর মেয়র নরুল ইসলাম আনছার আন্দোলন শুরু করেন । তারপর থেকে মশাল মিছিল, সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন থেকে কাফনের কাপড় পড়ে মিছিল হয়ে আসছে। এ-ই আসনে বিএনপি ৪ ভাগে বিভক্ত। বর্তমান ধানের শীষের প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী , মনোনয়ন প্রত্যাশি উপজেলা বিএনপির সভাপতি নরুল ইসলাম আনছার , মনোনয়ন প্রত্যাশি কষ্টিয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক শেখ সাদী ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় নেতা হাফেজ মঈনউদ্দীন ভিন্ন ভিন্ন প্লাটফর্মে অবস্থান করছেন।
জামায়াতে ইসলামী এ-ই আসনে বরাবরই শক্ত অবস্থানে ছিল। ১৯৯১ সালে অল্প ব্যবধানে আঃলীগের কাছে পরাজিত হয়, ১৯৯৬ সালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত বিএনপিকে সাপোর্ট করে। ২০১৪ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ২ টা পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান ও ১ টা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পায় জামায়াত। কুষ্টিয়াতে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কারনে ছাত্রশিবির খুব শক্তিশালী ও জনপ্রিয় সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ছাত্রশিবির কুমারখালী উপজেলাতে ৪ টা সাংগঠনিক থানায় কাজ করে, খোকসা উপজেলাতে ২ টা সাংগঠনিক থানায় কাজ করে। কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রশিবিরের জনশক্তির প্রধান সাপ্লাই চেইন এ-ই আসনের ছাত্র সংগঠন। বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সারাদেশের মতোই এ-ই আসনের দুইটা উপজেলাতে ছাত্রশিবির ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। যার কারনে তাদের একাধিক নেতাকর্মী নি হ ত ও বহু আ হ ত হয়েছে। মহিলা জামায়াতের সংগঠন আরো মজবুত। এ-ই আসনে স্হানীয় নির্বাচনে বরাবরই একাধিক মহিলা জামায়াতের প্রার্থী বিজয়
লাভ করে। তাছাড়া স্হানীয় নির্বাচনে বিভিন্ন ইউনিয়নে জামায়াতের প্রতিনিধিরা ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করে আসছে। এখানে শ্রমিক সংগঠনও মজবুত।
এ-ই আসনের দুইটা উপজেলাতে চরমোনাই পীর সাহেবের দল ইসলামি আন্দোলনের দুইটা উপজেলা কমিটি আছে। কিন্তু কার্যক্রম নেই বললেই চলে। বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে তাদের কমিটি ছিল শুধুমাত্র কাগজ-কলমে। ৫ ই আগষ্টের পর কিছু কর্মসূচি পালন করেছে যা চোখে পড়ার মতো না। তাছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কুমারখালী উপজেলাতে কাগজকলমে একটা কমিটি আছে। এছাড়া ৮ দলীয় জোটের বাদবাকি ৫ দলের কোন কমিটি নেই।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী বেশ অস্বস্তিতে আছেন। ভোটের আগ পর্যন্ত এমন অস্বস্তিকর পরিবেশ বজায় থাকলে ভোটের ফলাফলে বিপর্যয় ঘটবে বলে মনে করেন এ-ই আসনের রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী আফজাল হোসাইন দলের নেতাকর্মীদেন কাছে প্রিয় ব্যাক্তি প্রিয় মুখ। তারজন্য ৫ ই আগষ্টের পর থেকেই আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে নেতাকর্মীরা। প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও গ্রামে ব্যাপকভাবে গণসংযোগ করে আসছে। যার কারনে আফজাল হোসাইন এ-ই আসনে জনপ্রিয় মুখ থেকে জননেতায় পরিণত হয়েছেন। অনেকেই বলে, আফজাল হোসাইন এখনই অঘোষিত এমপি , জনতার এমপি । ধারণা করা হচ্ছে, ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে ভূমিধস জয় পাবে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার এ-ই প্রার্থী।
চরমোনাই পীরের প্রার্থী আনোয়ার খান এ-ই আসনে নতুন ও অপরিচিত মুখ। ৫ ই আগষ্টের আগে এ-ই নামে কোন নেতা আছে তা এ-ই অঞ্চলের লোক জানতেন না ; এখনো তেমন একটা জানে না। ৫ ই আগষ্টের অনেক পর মোটরবাইক শোডাউনের মধ্যে দিয়ে তিনি সোস্যাল প্লাটফর্মে আসেন। এ-ই আসনে চরমোনাই পীরের কার্যক্রম তেমন একটা নেই যার কারনে প্রার্থীর প্রচারনা একেবারেই সীমাবদ্ধ। এ-ই প্রার্থীর নিজস্ব কর্মী কিছু থাকলেও নিস্ক্রিয়। তাদের ফেস ভ্যালু নেই বললেই চলে। তাছাড়া চরমোনাই পীরের ভক্তদের একটা বড় অংশ অন্যদলগুলোর সাথে সম্পৃক্ত। কারন, কওমি অঙ্গনের বিভিন্ন ভাগ আছে। এছাড়াও এ-ই অঞ্চলে কওমি মাদ্রাসা খুবই কম। যার কারনে চরমোনাই পীরের সংগঠনের কার্যক্রম একেবারেই দূর্বল।
চরমোনাই পীরের প্রার্থী হঠাৎ রাজনীতির মাঠে আসার কারনে তাদের কর্মীদের মধ্যে ব্যালেন্স নেই। নির্বাচনী কৌশল নেই, ন্যারেটিভ নেই। তাছাড়া এ-ই আসনে ভোটারদের মধ্যে বড় অংশ নতুন ভোটার অর্থাৎ জেন-জি। এ-ই জেন-জি নিয়েও এদের কোন কর্মসূচি নেই। অন্যদলের প্রার্থীদের অবস্থা চরমোনাই পীর সাহেবের প্রার্থীর মতোই। নতুন ও অপরিচিত মুখ। প্রচারে সীমাবদ্ধতা। অনেকেই মনে করেন তফসিল ঘোষণার পর বিএনপি – জামায়াতের প্রচারনার ভিড়ে এ-ই সব ছোটখাটো দলের প্রার্থীরা মাঠ ছেড়ে দিতে পারেন।
এ-ই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও কুষ্টিয়া জর্জ কোর্টের এপিপি রবিউল ইসলাম জানান, ৫ ই আগষ্টের পর দেশ সম্পন্ন পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ এখন আর আঃলীগ বিএনপির ভোটের হিসেবে নেই। মানুষ বুঝতে শিখেছে অনেককিছু জানে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে স্হানীয় ভাবে অনলাইনে যতোগুলো জরিপ হয়েছে সবগুলোতে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আফজাল হোসাইন ব্যাপক ব্যবধানে এগিয়ে আছে। মানুষ সৎ যোগ্য ও দেশপ্রেমিক প্রার্থীর পক্ষে বলেই দাঁড়িপাল্লার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ-ই আসনে ৮ দলের একমাত্র প্রার্থী আফজাল হোসাইন। তার বিকল্প ভাবলেই নিশ্চিত ভরাডুবি।
জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে কুমারখালীর জুতা ব্যাবসায়ী আতিয়ার রহমান বলেন, এ-ই আসনে অন্যদল দ্বিধাবিভক্ত তাই জামায়াতে ইসলামী বিজয়ের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী। তাছাড়া এ-ই আসেন জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে ভালো শক্তিশালী। বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলন সংগ্রাম ছিল তিব্র। যার কারনে, তাদের অনেক কর্মী নি হ ত হয়েছে আ হ ত হয়েছে, তাদের নামে শতশত রাজনৈতিক মামলা হয়েছে। এ-ই কারনে এ-ই অঞ্চলের লোক জামায়াতে ইসলামীকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। পরিবেশ যে-ই অবস্থায় এ-ই অবস্থায় থাকলে জামায়াতের প্রার্থী ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করবে। কিন্তু ৮ দলের প্রার্থী আফজাল হোসাইনের বিকল্প ভাবলেই এ-ই আসন হাতছাড়া হয়ে যাবে। কারন, আফজাল হোসাইনের বিকল্প নেই।
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন এ-ই বিষয়ে জানান, এ-ই আসনে জামায়াত দল ও প্রার্থী হিসেবে শক্তিশালী ও জনপ্রিয়। বিভিন্ন জরিপেও তা-ই উঠে এসেছে। ভোট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে জামায়াতের প্রার্থী আফজাল হোসাইন ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে জিতবে। তা-ই ৮ দলের একমাত্র জনপ্রিয় প্রার্থী আফজাল হোসাইনের বিকল্প ভাবার সুযোগ নেই।
একই কথা বলেন, বেসরকারি চাকুরিজীবী আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে চাই, নিরাপদে বসবাস করতে চাই। এ-ই কারনে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবো, আফজাল হোসাইনকে এমপি বানাবে। আফজাল হোসাইনের জনপ্রিয়তার কাছে কেউ নেই। তার বিকল্প ভাবে মানে এ-ই আসনে জেনেশুনে পরাজিত হওয়া।
নির্বাচনের তফসিল ১১ ই ডিসেম্বর ঘোষণা করা হয়েছে । তফসিল ঘোষণার সাথেসাথে নির্বাচনী মাঠ আরো গ র ম হয়ে উঠেছে, নির্বাচনী লু হাওয়া বইছে। ইতিমধ্যে প্রার্থীদের উপর হা ম লা হয়েছে। জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে, আশঙ্কায় আছে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি-না ! এ-ই আসনের মানুষ মনে করে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আফজাল হোসাইন ব্যাপক ভোট জয়লাভ করবে। কারন, তার জয় দৃশ্যমান। গ্রাম থেকে পৌর সদরে সবখানেই আলোচনার শীর্ষে দাঁড়িপাল্লার আফজাল হোসাইন।


















