মিয়া সুলেমান, ইশ্বরগঞ্জ প্রতিনিধি:
তাই তো সে জানে না পুড়ানোর কী যন্ত্রণা
সেই আগুন বাঁচিয়ে দিল মা-ছেলেকে কিন্তু কেড়ে নিল তিন প্রাণ
ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ফোটেনি। উত্তরা ছিল নিস্তব্ধ। হঠাৎ করেই আগুনের লেলিহান শিখা আর আতঙ্কের চিৎকার ভেঙে দেয় সেই নীরবতা। রাজধানীর উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই কেড়ে নেয় ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার একই পরিবারের তিনটি প্রাণ। একটি পরিবার হারাল তার অভিভাবক, একটি মা হারাল তার ছেলেকে, আর একটি ঘর হারাল তার ভবিষ্যৎ।
নিহতরা হলেন—ঈশ্বরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের দড়িপাচাশি গ্রামের প্রয়াত হাফিজ উদ্দিনের ছেলে মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার বড় ছেলে রাহাব উদ্দিন (১৭) এবং ভাতিজি মোছা. রোদেলা আক্তার (১৪)।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে ভবনের দ্বিতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। আগুনের ভয়াল গ্রাসে পঞ্চম তলায় আটকে পড়েন হারিছ উদ্দিন, তার কিশোর ছেলে রাহাব ও ভাতিজি রোদেলা। ধোঁয়া আর আগুনের মাঝে আর বেরিয়ে আসার কোনো পথ ছিল না। ঘটনাস্থলেই থেমে যায় তিনটি জীবন।
হারিছ উদ্দিন ছিলেন একজন সংগ্রামী মানুষ। প্রায় তিন দশক আগে জীবিকার সন্ধানে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকায়। ফলের ব্যবসা করে গড়ে তুলেছিলেন ছোট্ট সংসার। স্ত্রী, দুই ছেলে—এই ছিল তার পৃথিবী। বড় ছেলে রাহাব ছিল পরিবারের স্বপ্ন, আর ছোট ছেলে নবাব ছিল জীবনের শেষ আশ্রয়।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—ঘটনার আগের রাতে ছোট ছেলে নবাবকে নিয়ে স্ত্রী রিনা আক্তার মিরপুরে বাবার বাড়িতে বেড়াতে যান। সেই সিদ্ধান্তই বাঁচিয়ে দেয় মা ও ছোট ছেলেকে। কিন্তু আগুনে ঝরে যায় পরিবারের তিনটি প্রাণ।
একই ভবনে বসবাস করত হারিছ উদ্দিনের ভাতিজি রোদেলা আক্তার। উত্তরার একটি মহিলা মাদ্রাসার ছাত্রী রোদেলা ছিল শান্ত স্বভাবের, স্বপ্নভরা চোখের এক কিশোরী। আগুন তার পড়াশোনা, তার স্বপ্ন—সবকিছুকে ছাই করে দেয়।
ঈশ্বরগঞ্জের দড়িপাচাশি গ্রামে শুক্রবার বিকেল থেকেই বইছে শোকের হাওয়া। নিহতদের বাড়িতে শুধু কান্না আর আহাজারি। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন হারিছ উদ্দিনের মা সাহারা খাতুন। সন্তান, নাতি আর ভাতিজিকে একসঙ্গে হারানোর বেদনা যেন তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে।
দড়িপাচাশি বায়তুন নুর জামে মসজিদের পাশে পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে তিনটি কবর। রাত ১০টায় জানাজা শেষে একসঙ্গেই চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন হারিছ উদ্দিন, রাহাব ও রোদেলা।
নিহত হারিছ উদ্দিনের চাচা ইসমাইল এবং মসজিদের ইমাম ও খতিব হাফেজ মো. আব্দুল আজিজ বাদশা বলেন, “একসঙ্গে তিনজনের মৃত্যু আমাদের গ্রামের ইতিহাসে বিরল ও বেদনাদায়ক ঘটনা। পরিবার ও পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ। আমরা দোয়া করি, আল্লাহ পাক যেন তাদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন।”
একটি আগুন শুধু একটি ঘর নয়—পুড়িয়ে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ভবিষ্যৎ। রেখে গেছে নিঃশেষ শূন্যতা, যা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।



















